বর্তমান সময়ে আপনি যদি কোনো কাউকে কয়েক জন বিজ্ঞানী নাম বলতে বলেন তাহলে তাদের বেশির ভাগেরই শীর্ষের তালিকায় স্যার আইজ্যাক নিউটন এর নাম থাকবে।তবে নিউটন শুধু একজন পদার্থবিদই ছিলেন না তিনি বিশ্বের সেরা তিন গণিতবিদদের একজন। বাকি দুজন আর্কিমিডিস ও কার্ল ফেডড্রিক গাউস ।

১৬৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা জানুয়ারিতে এই মহান ব্যক্তি জন্ম গ্রহণ করেন। জন্মস্থান লিংকনশায়ারের উলসর্থপ ম্যানরে। তবে তার জন্মের তারিখ করা হয় ১৬৪২ সনের ক্রিসমাস দিবসে। পিতা আইজ্যাক এর মৃত্যুর তিন মাস পর তিনি জন্ম নেন। নিউটন জন্মের সময় এতো ছোট ছিলেন যে তাকে একটি মগে রাখা সম্ভব ছিলো। তার মার নাম হানাহ এইসকফ। তার তিন বছর বয়সে তার মা রেভারেন্ড বার্নাবাউস স্মিথকে বিয়ে করেন। তখন তিনি তার নানী মার্গারি এইসকফ এর সাথে ছিলেন। নিউটন তার সৎ বাবাকে পছন্দ করতেন না। তিনি তার ১৯ বছর পর্যন্ত করা পাপ কাজ এর তালিকায় তিনি লিখেছেন তিনি তার মা বাবাকে তাদের থাকার ঘর পুড়িয়ে দেবে বলে ভয় দেখাতেন। ১২ বছর বয়সে তাকে গ্রান্হামের ব্যাকরণ স্কুলে ভর্তি করা হয়। সেখানে তিনি এক ঔষধ বিক্রেতার ঘরে থাকতেন। নিউটন ঐ স্কুলে ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। এ থেকে তার মেধার প্রমান পাওয়া যায়। নিউটনের বিভিন্ন যনত্র তৈরি করার ঝোঁক ছিল। সেই বয়সেই তিনি একটি চার চাকার বাহন তৈরি করে ছিলেন যা নিজেই আরোহী টেনে নিতে পারতো। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে নিউটনের সৎ বাবা মারা যাওয়ার পর তার মা উলসর্থপে ফিরে আসে এবং নিউটনকে খামারের কাজ শেখানোর উদ্দেশ্যে স্কুল থেকে ছাড়িয়ে নেন কিন্তু শিঘ্রই তিনি বুঝতে পারেন নিউটনের খামারের কাজে আগ্রহ নেই। নিউটনের চাচা ছিলেন বার্টন কলিগস এর রেক্টর তার উপদেশ শুনেই নিউটনকে ক্যামব্রীজের ট্রিনিটি কলেজে পড়ার জন্যে পাঠানো হয়। নিউটন ১৯৬১ সালে ট্রিনিটি কলেজ থেকে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। পড়ালেখার খরচ চালাতে তিনি ভৃত্যের কাজ করতেন। তিনি ট্রিনিটিতে গণিত এবং বলবিজ্ঞান নিয়ে অধিক পড়ালেখা করে ছিলেন। প্রথমে তিনি কেপলার এর আলোক বিজ্ঞান বিষয়ক সূত্রের উপর অধ্যয়ন করেন। তিনি একবার মেলা থেকে জ্যোতিশ শাস্ত্রের একটি বই কেনেন। কিন্তু বইয়ের বেশ কিছু রেখা চিত্র তিনি বুঝতে পারছিলেন না। তাই এগুলো বুঝতে তিনি ইউক্লিডের জ্যামিতি পড়তে থাকেন কিন্তু তবুও তিনি কিছুই বুঝতে পারলেন না, তাই তিনি রেগে বইটি ফেলে রাখেন। তবে তার শিক্ষক আইজ্যাক বারোর উপদেশে তিনি আবারও বইটি পড়তে থাকেন । বই আসলে রেনে দেকার্তের জ্যামিতিক গবেষণার উপর। নিউটন তার পড়া বইগুলো একটি তাকে সাজিয়ে রাখতেন। ১৬৬৫ সালে স্নাতক ডিগ্রি লাভের আগেই তিনি তার দ্বিপদী উপপাদ্য প্রমান করেন। ১৬৬৫ সালে ক্যামব্রিজ ও লন্ডনে প্লেগ রোগ মহামারী আকার ধারণ করে। ফলে ট্রিনিটি কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। তিনি আবারও লিংকনশিয়ারে ফিরে যান। উল্সথর্প ফিরে এসেও নিউটন থেমে থাকেননি। সেখানে মূলত রসায়ন এবং আলোকবিজ্ঞান বিষয়ের উপর বিভিন্ন পরীক্ষণ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং একইসাথে চলতে থাকে তার গাণিতিক অনূধ্যানের প্রকল্পসমূহ। নিউটন তার মহাকর্ষ তত্ত্ব আবিষ্কার বিষয়ক দিনপঞ্জির সূচনা চিহ্নিত করেছিলেন এই ১৬৬৬ সনকেই, যে সনে তাকে ট্রিনিটি কলেজ ছেড়ে যেতে হয়েছিল। এ সম্বন্ধে তিনি বলেছেন:
“ একই সালে আমি চাঁদের কক্ষপথে বিস্তৃত অভিকর্ষ নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করি,… চাঁদকে তার নিজ কক্ষপথে ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় বল এবং পৃথিবীর পৃষ্ঠতলে বিরাজমান অভিকর্ষ বলের মধ্যে তুলনা করি এবং এই দুটি বলের মান প্রায় সমান বলে চিহ্নিত করতে সক্ষম হই।”

১৬৮৪ সালের আগে তিনি মহাকর্ষ সম্মনধে তার গবেষণা প্রকাশে তাগিদ অনুভব করেন নি। নিউটন তার মহাকর্ষ বলে বলেছেন: মহাকর্ষের জন্য গ্রহগুলো ঘুরতে থাকে তবে কে তাকে ঘূর্ণনশীল রেখেছেন তা বলা যাবে না। একথা থেকে বোঝা যায় নিউটন নাস্তিক ছিলেন না। যিশু খ্রিস্ট মে ঈশ্বরের পুত্র তা তিনি বিশ্বাস করতেন না। তিনি মানতেন ঈশ্বর একজন। এডমুন্ড হ্যালি এবং স্যার ক্রিস্টোফার রেন মহাকর্ষ সম্বন্ধে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু তত্ত্ব বা তথ্য আবিষ্কার করেছিলেন যদিও তারা কেউই গ্রহের কক্ষপথ সম্বন্ধে কোন সুনির্দিষ্ট তত্ত্ব প্রদানে সক্ষম হন নি। ঐ বছর বিজ্ঞানী এডমুন্ড হ্যালি এ বিষয়টি সম্বন্ধে নিউটনের সাথে কথা বলেন এবং এই দেখে অবাক হন যে নিউটন বিষয়টি এতোদিনে সমাধান করে ফেলেছেন। নিউটন হ্যালির কাছে চারটি উপপাদ্য এবং সাতটি সমস্যা প্রস্তাব করেন যেগুলো তার গবেষণা কাজের মূল অংশ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে। ১৬৮৫ এবং ১৬৮৬ সালের মধ্যে প্রায় সতের-আঠারো মাস জুড়ে তার লেখা সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ তথা ফিলোসফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথামেটিকা রচনা করেন যার ইংরেজি নাম দেয়া হয় Mathematical Principles of Natural Philosophy। এই গ্রন্থের তিনটি অংশ আছে। নিউটন তৃতীয় অংশটিকে সংক্ষিপ্ত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হ্যালি তাকে তৃতীয় অংশটি বিস্তারিত লেখার ব্যাপারে উৎসাহিত করেন। রয়েল সোসাইটি গ্রন্থটি প্রকাশের অর্থ সংকুলানে অপারগতা প্রকাশ করে। এবারও হেলিই এগিয়ে আসেন। তিনি বইটি প্রকাশের সমস্ত ব্যয়ভার বহন করেন এবং এর ফলে ১৬৭৮ সনে পদার্থবিজ্ঞান ও গণিতের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় এই বইটি প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর সমগ্র ইউরোপ জুড়ে এটি বিপুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়। এরই ধারাবাহিকতায় তখনকার সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে খ্যাত ক্রিশ্চিয়ান হাইগেন্স ১৬৮৯ সনে নিউটনের সাথে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করার জন্য ইংল্যান্ডে যান। যদিও জীবনের প্রথম ভাগ থেকেই নিউটন ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়াশোনা করে আগ্রহ পেতেন। ১৬৯০ সনের আগে থেকেই তিনি ধর্মীয় ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। সে সময় তিনি লকের কাছে লেখা পত্রে এ সম্বন্ধে বিস্তারিত বর্ণনা দেন। এই পত্রটির নাম ছিল An Historical Account of Two Notable Corruptions of The Scriptures। এই পত্রটি ট্রিনিটির দুইটি প্যাসেজ বিষয়ে লেখা। এছাড়াও তিনি মৃত্যুর পূর্ব একটি পাণ্ডুলিপি লিখে যান। এর নাম Observations on the Prophecies of Daniel and the Apocalypse। এছাড়াও বাইবেলের কিছু সমালোচনা, ভাষ্য ও টীকা তিনি রচনা করেছিলেন। ক্যালকুলাস নিয়ে লিবনিজের সাথে নিউটনের তর্ক -বিতর্ক হয়। যার ফলে তিনি প্রিন্সিপিয়া বইটি পরিবর্তন করেন।
নিউটন ছিলেন গভির চিন্তাশীল মানুষ। কথিত আছে নিউটন একবার একটি মেয়ের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন কথা বলার সময় হঠাৎ তার মনে কোনো এক চিন্তা এসে যাওয়ায় তিনি চিন্তায় ডুবে গেলেন। ভূলে তিনি সিগারেট জ্বালাতে গিয়ে মেয়েটির হাত জ্বালিয়ে দেন মেয়েটি চিৎকার করতে থাকলেও চিন্তায় ডুবে থাকায় নিউটন কিছুই বুঝতে পারেন নি। যার ফলে তিনি কখনো বিয়ে করেন নি।
১৭২৫ খ্রিস্টাব্দের পর নিউটনের স্বাস্থ্যের ব্যাপক অবনতি ঘটে। এর ফলে একজন ডেপুটি মিন্টে তার কাজ মওকুফ করার ব্যবস্থা করে দেন। ১৭২৭ সনের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি শেষবারের মত রয়েল সোসাইটির সভাপতি হিসেবে কার্য পরিচালনা করেন। ১৭০৩ সাল থেকেই তিনি এই সোসাইটির সভাপতি ছিলেন। ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ তারিখে ৮৫ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবে-তে সমাধিস্থ করা হয়।
Source: Wikipedia.
Writer: MD Amiyo Hasan Laskar.
Site: Crypto Question Festival.
link: http://www.cryptoquestionfestival.code.blog.
Facebook link of Amiyo: https://www.facebook.com/profile.php?id=100081051165472
Leave a comment